December 16, 2019, 12:19 am

বিজ্ঞপ্তি :
আমাদের সাইটে স্বাগতম...

মেঘনা নদী উদ্ধারে বিতর্কিত ভূমিকায় বিআইডব্লিওটিএ

মোক্তার হোসেন মোল্লা :
নদী খেকোদের দখলের কবলে পড়ে মেঘনা নদীর সোনারগাঁয়ের অংশটি বর্তমানে অস্তিত্ব সঙ্কটে পরেছে। বহুদূর থেকে মেঘনা নদীর দিকে তাকালে চোখে পড়ে নদীর তীরবর্তি বিশাল এলাকাজুড়ে শুধু দখলদারিত্ব ও বিশাল বিশাল স্হাপনা। শুধু নদীর জায়গা নয়, শাখা নদী, খাস সম্পত্তি, নদী তীরবর্তী ফোরসোর ল্যান্ডভূক্ত জমি ও সরকারি খালের জমি এবং কৃষকের কৃষি জমি জোরপূর্বক দখল করে গড়ে তুলেছেন বিশাল বিশাল স্থাপনা। প্রভাবশালী নদীখেকোরা মেঘনা নদীটি অবৈধভাবে দখল-দূষণ করে বিভিন্ন ধরনে স্থাপনা নির্মাণ করে পরিবেশকে মারাত্মক ধ্বংসের মুখে ফেলেছে। মেঘনা নদী প্রতিনিয়ত দখল হলে নদী উদ্ধারে কোন কার্যক্রম নেই বিআইডব্লিওটিএ।

স্হানীয়রা জানায়, বিআইডব্লিওটিএ এর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ম্যানেজ করে প্রকাশ্যে একের পর এক স্হানে মেঘনা নদী ও শাখা নদীর জায়গা দখল করে গড়ে তুলেছেন স্থাপনা। প্রতিনিয়ত শিল্প প্রতিষ্ঠান গুলো পাইলিং, বাউন্ডারী ওয়াল নির্মান ও বালু ফেলে প্রতিনিয়ত নদীর গভীরে দখল করছে।

এদিকে, বিগত কয়েকদিন যাবত সোনারগাঁয়ের কাঁচপুরে শীতলক্ষা নদী উদ্ধারে বাপক অভিযান পরিচালনা করছে বিআইডব্লিওটিএ। কোথাও কোথাও স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে; আবার কোথাও কোথাও দখলকারীদের দু’একদিনের মধ্যে নিজেদের স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে বিআইডব্লিওটিএ। কিন্তু মেঘনা উদ্ধারে ও উদ্ধারকৃত জমি রক্ষায় কোন কার্যকর ব্যবস্হা নিতে পারে নি বিআইডব্লিওটিএ। এদিকে, বিআইডব্লিওটিএ ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগীতা ছাড়া এভাবে নদী দখল সম্ভব নয় বলে স্হানীয়রা জানায়।

জানা গেছে, মেঘনা নদী দখল ও দূষনের বিষয়ে দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় একাধিক সংবাদ প্রকাশ হবার পর টনক নড়ে সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের। ‘মেঘনা নদীর পাড় দখল’ নিয়ে ৬ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে বিআইডব্লিউটিএ। চলতি বছরের ১৯ মে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ব্যাপক ডাক দোল পিটিয়ে ‘মেঘনা নদীর তীরবর্তী ‘দখল’ উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে বিআইডব্লিওটিএ। বিগত ১৯ মে থেকে মেঘনা নদী দখল মুক্ত করার অভিযান শুরু হয় এবং পর্যায়ক্রমে ছয়দিন চলে অভিযান। অভিযান পরিচালনার সময় নদী সবচেয়ে বেশি দখলকারী দেশের প্রভাবশালী কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দখলকৃত মেঘনা নদী, নদীর তীরবর্তী খাস ভূমি, সরকারি খাল এবং ফোরশোর ল্যান্ডভূক্ত ভূমিতে বালু ভরাট করে প্রাচীর দিয়ে দখল করার পরও অভিযান চালায়নি বিআইডব্লিওটিএ। তখন বিআইডব্লিওটিএ কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করেন, বিগত ঈদুল ফিতরের পরে পুনরায় অভিযান পরিচালনা হবে এবং উচ্ছেদের আওতায় পরবে নদী দখলকারী সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
এমনকি তৎকালিন সময়ে নদীতে ভরাটকৃত বালু কয়েক কোটি টাকায় নিলামে বিক্রি করার পর এখনো বালু সরানো হয়নি। উল্টো আরো বালু ফেলে দখল অব্যহত রাখছে প্রভাবশালী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। অভিযান পরিচালনার সময় বিআইডব্লিওটিএ জানায়, মেঘনার পাড় দখলমুক্ত করতে অভিযান অব্যহত থাকবে। কিন্তু অভিযানতো দূরের কথা উল্টো তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় দখল হচ্ছে মেঘনা নদী এমনটাই জানিয়েছে স্হানীয়রা।

জানা গেছে, বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮ (ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষন ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রানীর সংরক্ষন ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন।” এদিকে, বিআইডব্লিওটিএ নদীখেকোদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়ে নদী রক্ষা না করে নদী দখল ও মারাত্মক দূষনে সহায়তা করছে বলে স্হানীয়রা অভিযোগ করেন।

জানা গেছে, প্রাকৃৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০-এ বলা হয়েছে, ‘প্রাকৃৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না বা উক্তরূপ জায়গা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করা যাবে না, বা অনুরূপ ব্যবহারের জন্য ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করা যাবে না।’ আইনের সংজ্ঞার ‘চ’ অংশে বলা হয়েছে, ‘প্রাকৃতিক জলাধার’ অর্থ নদী, খাল, বিল, দীঘি, ঝরনা বা জলাশয় হিসেবে মাস্টার প্ল্যানে চিহ্নিত বা সরকার, স্থানীয় সরকার, কোনো সংস্থা কর্তৃক, সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা, বন্যাপ্রবাহ এলাকা হিসেবে ঘোষিত কোনো জায়গা এবং সলল পানি এবং বৃষ্টির পানি ধারণ করে এমন কোনো ভূমিও ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে।’ আর শ্রেণী পরিবর্তন বলতে ‘মাটি ভরাট, পাকা, আধাপাকা বা কাঁচা ঘরবাড়ি এবং অন্য যে কোনো ধরনের ভবন নির্মাণসহ কোনোভাবে সেই অবস্থার পরিবর্তন হইতে পারে এমন কিছুকে বুঝাইবে।’ এই আইন অনুযায়ী নদী বা নদীতীরবর্তী প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট, দখল ও জলাশয়ের শ্রেণী পরিবর্তন সম্পূর্ণ বেআইনি ও নিষিদ্ধ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইন অনুযায়ী, যেকোনো আবাসন বা বড় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করে এর অনুমোদন নিতে হয়। প্রয়োজন হয় অবস্থানগত ছাড়পত্রের। এসবের পর পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করতে হয়। এসব ছাড়পত্র পেলে তবেই মাটি ভরাটসহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ করতে হয়। কিন্তু মেঘনা নদী খেকো শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো এই পক্রিয়া ও পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই বালু ভরাট করে নদী ও কৃষকদের জমি জোরপূর্বক দখল করেছে।

আরো জানা গেছে, হাইকোর্ট বিভাগের রীট মামলা নং ৩৫০৩/২০০৯, ১১৪৫৪/১৮ এবং ১১৬১৯/১৮ এর আদেশ এবং হাইকোর্টের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী নদী তীরবর্তী ফোরসোর ল্যান্ডভূক্ত ৫০ মিটার ভূমিতে বালি ও মাটি ভরাটসহ যে কোন স্হাপনা নির্মান করা সম্পূর্ন অবৈধ। এমনকি, নদী খেকো কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাজ বন্ধে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও উপজেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিওটিএ এর সহযোগীতায় তারা বীরদর্পে নদী দখল ও ভরাট করে বড় বড় স্হাপনা নির্মান করছে।

এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ও সচিব ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার আকস্মিকভাবে সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদীর তীরবর্তী এলাকা পরিদর্শন করে মেঘনা নদী দখলের ভয়াবহতা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। পরে তিনি সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে স্থানীয় নদী রক্ষা কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় কালে বলেন, বর্তমানে মেঘনা নদীর অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ। যেভাবে কোম্পানিগুলো নদী দখল করে
আছে, তাতে মনে হচ্ছে তারাই নদীর মালিক। এসব দখলদার যতই ক্ষমতাশীল হোক না কেন, আগামী দু’দিনের মধ্যে তাদের স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। প্রয়োজনে নদী রক্ষা কমিশন থেকে অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সঙ্গে এনে অভিযান পরিচালনা করবেন।
নদী দখলের ভয়াবহতা দেখে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনকে ভর্ৎসনা করে বলেন, আপনারা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি হয়ে কী করেন। আপনাদের সামনে নদী দখল হয়ে যাচ্ছে। দখলদারদের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত ব্যবস্থা নেন। তাদের বিরুদ্ধে একটা মামলাও করলেন না। শুধু নোটিশ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছেন। শুধু নোটিশ দেওয়া তো আপনাদের কাজ নয়। অভিযানে নেমে যান। আমি আপনাদের সঙ্গে আছি। প্রয়োজন হলে এসব দখলদারের তালিকা আমি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠাব। কারও হুমকি-ধমকিতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু তাতেও দৃশ্যত কোন ব্যবস্হা নেওয়া হয়নি নদীখেকোদের বিরুদ্ধে।

স্হানীয় এলাকাবাসী জানায়, নদী খেকোরা বিআইডব্লিওটিএ এর প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় নদী দখল করে। নদী খেকোদের বিরুদ্ধে কোন কথা বললে, হুমকি ও মামলা দিয়ে দেয় নদী খেকোরা। নদী খেকোদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় অাইনগত ব্যবস্হা নিতে বিআইডব্লিওটিএ ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে ঘুরেও কোন প্রতিকার পায়নি ভূক্তভোগী জনগন। নদী, সরকারি খাল ও কৃষি জমি উদ্ধারে স্হানীয় এলাকাবাসি ও পরিবেশ বাদী সংগঠনগুলো একাধিকবার মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ, রাস্তা অবরোধ ও স্মারকলিপি প্রদান করে কোন ফল পায়নি।

সরেজমিনে মেঘনা নদীতে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার মেঘনা ঘাট, বৈদ্যেরবাজার, হাড়িয়া ও আনন্দ বাজার এবং বারদী এলাকাসহ নদী তীরবর্তী প্রতিটি স্হানে মেঘনা নদী দখলের মহাউৎসব চলছে। স্হানীয় প্রশাসন ও বিআইডব্লিওটিএ বৃদ্ধাআঙ্গুলী দেখিয়ে বীরদর্পে নদী দখল করে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রভাবশালী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে
হাইকোর্টের স্হিতিবস্হা বজায় থাকা অবস্হায়ও তারা বালু ভরাটসহ শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাজ করে যাচ্ছে। এমনকি মেঘনা নদীর শাখা ও সরকারি খালগুলো বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে। মেনীখালি নদী, ঐতিহাসিক রান্দির খাল, ছাওয়াল বাগীনী নদী প্রায় ধ্বংশের পথে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আগ্রাসনে।
এদিকে, প্রতিনিয়ত দখলে-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে মেঘনা। তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা অসংখ্য কলকারখানা থেকে নির্গত দূষিত পানি ও আবর্জনা অবাধে মিশছে মেঘনা নদীতে। দূষণ আর দখলে হারাতে বসেছে প্রমত্তা মেঘনার পূর্বের জৌলুস। অবৈধ দখলদারের দৌরাত্মে ক্রমেই সরু হয়ে আসছে নদীটির আকার। মাটি আর আবর্জনা ফেলে ভরাট হচ্ছে নদী। আর বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ও পাড়ে বালু দিয়ে অবাধে ভরাট হচ্ছে মেঘনা। অতিরিক্ত দখলের কারনে বদলে যাচ্ছে নদীর গতিপথ। মেঘনা নদীতে অবাধে মিশছে কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য। ময়লা আবর্জনা বদলে দিয়েছে পানির রং আর গন্ধ। তৈরি হচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি। আর বিভিন্ন শাখা নদী ও খাল দখল করায় মারাত্মক জলাবদ্ধতায় পরেছে স্হানীয় এলাকাবাসী। কিন্তু নদী রক্ষার দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিওটিএ মেঘনা নদী উদ্ধারে একেবারেই উদাসিন। এমনকি নদী উদ্ধারে কোন ভূমিকা না থাকলেও নদী দখলে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে বিআইডব্লিওটিএ এর বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশ নদী বাচাও আন্দোলন নারায়নগঞ্জ জেলা সভাপতি কবি জামান ভূইয়া জানায়, মেঘনা যেন বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষা না হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআইডব্লিওটিএ ও স্হানীয় প্রশাসনকে নদী রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্হা নিতে হবে। সবাইকে বুঝতে হবে, নদী বাঁচলে, তবে বাঁচবে দেশ। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে নদী উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা নিতে হবে। তা না হলে মেঘনা নদী বুড়িগঙ্গা হতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

Leave a Reply

© All rights reserved © 2017 সোনারগাঁও খবর
Design BY Codeforhost.com
themesbsongar1727434411